আমাকে ফেইসবুকে এবং বাস্তব জীবনে অনেক মানুষ জিজ্ঞাসা করেন কোন ল্যাপটপ কিনবেন। আসলে এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। অনেক ধরনের ল্যাপটপ আছে। এক একজনের বাজেট এবং requirements অনুযায়ী এক এক ধরনের ল্যাপটপ কেনা উচিৎ।
কয়েকটি কম্পোনেন্ট বা যন্ত্রাংশ নিয়ে একটি ল্যাপটপ তৈরি হয়। প্রতিটি কম্পোনেন্টের নির্দিষ্ট কিছু কাজ আছে। এসব কম্পোনেন্ট ব্যাপারে বিস্তারিত জানলে আপনি নিজেই আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী ল্যাপটপ বাছাই করতে পারবেন। আপনি যখন কারো কাছে ল্যাপটপ কিনার সাজেশন চাইবেন তখন তিনি ওনার পছন্দ অনুযায়ী ল্যাপটপ সাজেস্ট করবেন। যেমন আপনি প্রোডাক্টিভিটির জন্য ল্যাপটপ চাচ্ছেন, একজন গেমারের কাছে সাজেশন চাইলে তিনি হয়ত গেমিং ল্যাপটপ সাজেস্ট করবেন। আপনার টাকা দিয়ে আপনি কেন আরেকজনের পছন্দের ল্যাপটপ কিনবেন। তাই নিজের জন্য নিজেই ল্যাপটপ বাছাই করা উচিৎ বলে আমি মনে করি।
আমি এখানে ল্যাপটপের বিভিন্ন কম্পোনেন্টের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করছি। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম নির্ভর ল্যাপটপগুলোর কম্পোনেন্ট নিয়ে প্রথমে লিখব। আর্টিকেলের শেষে ম্যাকবুক নিয়ে কথা বলব।
প্রসেসর (Processor): প্রসেসর হচ্ছে একটি ল্যাপটপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট। প্রসেসরকে একটি ডিভাইসের ব্রেইন বলা যেতে পারে যেটি ডিভাইসের অন্যান্য যন্ত্রাংশ সমন্বিত করে নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করে। প্রসেসরের উপর নির্ভর করে ল্যাপটপটি কেমন পারফর্ম করবে। তাই ল্যাপটপ কেনার সময় ভাল প্রসেসর সিলেক্ট করা খুব প্রয়োজনীয়। ল্যাপটপের কিছু যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা গেলেও প্রসেসর সাধারণত পরিবর্তন করা যায় না। তাই সতর্কভাবে ল্যাপটপের প্রসেসর বাছাই করতে হবে কারণ এই ল্যাপটপ যতদিন চালাবেন ততদিন এই প্রসেসরেই কাজ করতে হবে।
বর্তমানে ল্যাপটপের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রসেসর ২টি হচ্ছে Intel এর প্রসেসর এবং AMD এর Ryzen প্রসেসর। ২টি প্রসেসরই ল্যাপটপের জন্য ভাল। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি Ryzen প্রসেসরগুলো Intel প্রসেসর এর চেয়ে কিছুটা কম Resources (CPU, Ram, Disk Space) ব্যবহার করে। ফলে Ryzen প্রসেসরে Intel এর চেয়ে কিছুটা ভালভাবে মাল্টিটাস্কিং করা যায়। High configuration ল্যাপটপের ক্ষেত্রে এটা কোনো ব্যাপার না কারণ এসব ল্যাপটপে অনেক বেশি র্যাম, ডিস্ক স্পেস এবং প্রসেসরের স্পিড ভাল থাকে। তবে লো বাজেটের ল্যাপটপের ক্ষেত্রে বর্তমানে Ryzen প্রসেসর ভাল পারফর্ম করবে বলে আমি মনে করি।
প্রসেসর বিভিন্ন টাইপের হয় এবং প্রতিটি টাইপের বিভিন্ন জেনারেশন থাকে। যেমন ইন্টেলের Celeron, Core i3, Core i5, Core i7, Core i9 ইত্যাদি টাইপের প্রসেসর যেগুলোর 1st, 2nd, 3rd… বিভিন্ন রকম জেনারেশন হয়। ইন্টেল প্রতি বছর একটি নতুন জেনারেশনের প্রসেসর বের করে। বর্তমান ২০২২ সালে ইন্টেলের 12th জেনারেশন প্রসেসর রিলিজ হয়েছে। রাইযেনের Ryzen 3, Ryzen 5, Ryzen 7 ইত্যাদি টাইপের প্রসেসর হয় যেগুলোর 1st, 2nd, 3rd… বিভিন্ন রকম জেনারেশন হয়। রাইযেনও প্রতি বছর একটি নতুন জেনারেশনের প্রসেসর বের করে। বর্তমান ২০২২ সালে রাইযেনের 6th জেনারেশন প্রসেসর রিলিজ হয়েছে।
প্রসেসর টাইপের সাথে জেনারেশনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেকে মনে করেন যে core i3 থেকে core i5 ভাল, core i5 থেকে core i7 ভাল। কথাটি সেইম জেনারেশনের ক্ষেত্রে সঠিক। অর্থাৎ 12th generation core i3 থেকে 12th generation core i5 বেশি ভাল পারফর্ম করবে, 12th generation core i5 থেকে 12th generation core i7 বেশি ভাল পারফর্ম করবে। কিন্তু 9th generation core i5 থেকে 12th generation core i3 প্রসেসর ভাল পারফর্ম করবে, 9th generation core i7 থেকে 12th generation core i5 প্রসেসর ভাল পারফর্ম করবে। Ryzen প্রসেসরের জন্যও প্রসেসর টাইপ এবং জেনারেশন একিভাবে কাজ করে। কোন প্রসেসর ভাল পারফর্ম করবে কিভাবে বুঝবেন? একটি শর্টকাট হচ্ছে গুগলে “`Processor name` benchmark” লেখে সার্চ করা। https://www.cpubenchmark.net/ ওয়েবসাইটে সেই প্রসেসরের একটি স্কোর দেখতে পাবেন। যেই প্রসেসরের স্কোর বেশি সেটি সাধারণত ভাল পারফর্ম করে। এভাবে সবসময় একদম সঠিক আইডিয়া পাবেন তা নয়। তবে মোটামুটি ভাল আইডিয়া পাওয়া যায়। সঠিক আইডিয়া পাওয়ার জন্য আপনাকে প্রসেসরের Total number of cores, total number of threads, base clock speed, turbo clock speed, power efficiency ইত্যাদি কম্পারিজন করতে হবে, ইউটিউবে রিভিউ দেখতে হবে। এসব টার্ম দিয়ে কি বুঝায় সেটা বলতে গেলে আর্টিকেল অনেক বড় হয়ে যাবে, তাই আমি এগুলো আর এক্সপ্লেইন করছি না। প্রসেসরের নামের শেষের লেটার দিয়েও প্রসেসর কতটা পাওয়ার্ফুল সেটা বোঝা যায়। H (যেমন i9–10850HK, i5–11300H) দিয়ে বোঝায় high performance processor যেগুলো গেমিং ল্যাপটপে বেশি ব্যবহৃত হয়, G (যেমন i5–1035G1, i7–1165G7) দিয়ে বোঝায় প্রসেসরটিতে ভাল integrated graphics রয়েছে, U (যেমন i5–1035G1, i7–1165G7) দিয়ে বোঝায় এই প্রসেসরটি তুলনামূলক কম পাওয়ার ব্যবহার করে। প্রসেসর ব্যাপারে আর বিস্তারিত জানার জন্য https://www.intel.ca/content/www/ca/en/processors/processor-numbers.html এই লিংকটি ভিজিট করতে পারেন। চেষ্টা করবেন বেশি benchmark স্কোর এবং লেটেস্ট জেনারেশন প্রসেসরের ল্যাপটপ নাওয়ার জন্য। কারণ এক জেনারেশন কম প্রসেসর নাওয়া মানে হচ্ছে আপনি এক বছর পুরনো ডিভাইস নিচ্ছেন।
র্যাম (Ram): আমরা যখন কোনো প্রোগ্রাম কম্পিউটারে রান করি তখন প্রসেসর সেই প্রোগ্রামটি র্যামের মধ্যে রাখে যেন খুব দ্রুত প্রোগ্রামটি এক্সেস করা যায়। র্যাম যত বেশি হবে তত ভালভাবে মাল্টিটাস্কিং অর্থাৎ এক সাথে অনেকগুলো প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে পারবেন। ল্যাপটপে কমপক্ষে 8GB (৮ গিগাবাইট) র্যাম থাকা ভাল। লো বাজেটের ল্যাপটপ গুলোতে সাধারণত 4GB র্যাম দেয়া থাকে এবং একটি এক্সট্রা র্যাম স্লট থাকে। সেক্ষেত্রে ল্যাপটপ কিনার সময় অথবা আপনার সুবিধামত সময়ে আরেকটি র্যাম লাগিয়ে নিতে পারবেন। আরেকটি র্যাম 4GB/8GB/16GB আপনার বাজেট অনুযায়ী এবং আপনার ল্যাপটপ সর্বোচ্চ কত গিগাবাইট র্যাম সাপোর্ট করে সেটা দেখে লাগাবেন। আরেকটি র্যাম লাগানোর সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যেন র্যাম ২টি একি বাস স্পিডের হয়। যেমন একটি ল্যাপটপে যদি বিল্ট ইন 3200MHz bus speed র্যাম থাকে তাহলে আরেকটি র্যাম লাগানোর সময় 3200MHz bus speed এর র্যাম লাগাবেন। বাস স্পিড সেইম না হলে ল্যাপটপে প্রব্লেম ফেইস করতে পারেন।
অপারেটিং সিস্টেম (Operating System): অনেক ল্যাপটপে Windows operating system ইন্সটল করে দেয়া থাকে, অনেকগুলোতে থাকে না। ল্যাপটপে Windows ইন্সটল থাকার সুবিধা হচ্ছে এখানে আপনি genuine windows অর্থাৎ লাইসেন্স কি সহ উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম পাবেন। সেক্ষেত্রে উইন্ডোজ অ্যাক্টিভেট করার আর ঝামেলা থাকে না। যেসব ল্যাপটপে উইন্ডোজ ইন্সটল থাকে না সেগুলো কেনার সময় বিক্রেতা ল্যাপটপে উইন্ডোজ ইন্সটল করে অ্যাক্টিভেট করে দিবেন। তবে এটি জেনুইন উইন্ডোজ হবে না। জেনুইন এবং ক্র্যাকড উইন্ডোজ সব কাজ একি রকম করবে, শুধু পার্থক্য হচ্ছে ক্র্যাকড উইন্ডোজে অনেক সময় ভাইরাস থাকতে পারে। তাই উইন্ডোজ ইন্সটল সহ নাকি উইন্ডোজ ছাড়া ল্যাপটপ নিবেন সেটা চিন্তা করে নিন। আর আপনি লিনাক্সের কোনো ডিস্ট্রো অথবা অন্য কোনো অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করতে চাইলে উইন্ডোজ ইন্সটল ছাড়া ল্যাপটপ নিতে পারেন।
ডিসপ্লে (Display): ল্যাপটপের ডিসপ্লে বিভিন্ন সাইজের হয়ে থাকে। সাধারণত ল্যাপটপের ডিসপ্লে সাইজ ১১ ইঞ্চি থেকে ১৭ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। আপনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী ডিসপ্লে সাইজ সিলেক্ট করতে পারেন। আপনার যদি ছোটো ল্যাপটপ পছন্দ হয় তাহলে ১৩ ইঞ্চি ডিসপ্লের ল্যাপটপ নিতে পারেন, বড় ল্যাপটপ পছন্দ হলে আপনার বাজেট অনুযায়ী ১৫/১৬/১৭ ইঞ্চি ল্যাপটপ নিতে পারেন। ডিসপ্লে সিলেক্ট করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ডিসপ্লে রেজুলেশন (Display Resolution)। ডিসপ্লে সাধারণত HD (1366x768 pixels), FHD (1920x1080 pixels), QHD / 2K (2560x1440 pixels), UHD / 4k (3840 x 2160 pixels) এসব রেজুলেশনের হয়ে থাকে। ডিসপ্লে রেজুলেশন যত বেশি হবে ডিসপ্লের কন্টেন্ট তত বেশি সুন্দর দেখাবে। আপনার বাজেট অনুযায়ী ডিসপ্লে রেজুলেশন সিলেক্ট করবেন তবে চেষ্টা করবেন কমপক্ষে FHD - Full HD (1920x1080 pixels) ডিসপ্লে সহ ল্যাপটপ নাওয়ার জন্য। ডিসপ্লের আরেকটি ফ্যাক্টর হচ্ছে টাচ অথবা নন টাচ ডিসপ্লে। আপনার ল্যাপটপে টাচ স্ক্রিন দরকার হলে এবং বাজেট বেশি থাকলে টাচ ডিসপ্লের ল্যাপটপ সিলেক্ট করতে পারেন। সাধারনত ল্যাপটপের স্ক্রীন রিফ্রেশ রেট 60Hz হয়ে থাকে। গেমিং ল্যাপটপগুলোতে স্ক্রীন রিফ্রেশ রেট বেশি থাকে যেন গেমিং করতে সুবিধা হয়। আপনি গেম খেলার জন্য ল্যাপটপ কিনলে বেশি স্ক্রীন রিফ্রেশ রেটের ল্যাপটপ কিনতে পারেন। নর্মাল ইউসেজের জন্য স্ক্রীন রিফ্রেশ রেট 60Hz যথেষ্ঠ। এছাড়া ডিস্প্লের sRGB, adobe color gamut এর উপর ডিস্প্লের কোয়ালিটি নির্ভর করে। গুগলে ‘laptop screen color gamut’ লেখে সার্চ করলে এই ব্যাপারে বিস্তারিত পেয়ে যাবেন।
স্টোরেজ (Storage): স্টোরেজ হচ্ছে এমন একটি ডিভাইস যেখানে আপনি Data সেইভ করে রাখতে পারবেন। Hard Disk Drive (HDD), Solid State Drive (SSD), Pendrive, Micro SD Memory Card ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের স্টোরেজ ডিভাইস রয়েছে। ল্যাপটপে সাধারণত শুধু HDD অথবা শুধু SSD অথবা HDD এবং SSD এক সাথে থাকতে পারে। HDD থেকে SSD অনেক ফাস্ট হয় কিন্তু SSD এর দাম HDD থেকে অনেক বেশি হয়। বর্তমান লো বাজেট ল্যাপটপের জন্য আইডিয়াল হচ্ছে একটি কম স্টোরেজের SSD যেখানে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ইন্সটল থাকবে, আর একটি বেশি স্টোরেজের HDD যেখানে অন্যান্য ডকুমেন্টস স্টোর থাকবে এভাবে ব্যবহার করা। অনেকে কম বাজেট থাকায় 128GB(128 Gigabytes) SSD নিয়ে থাকেন। তবে আমি মনে করি কমপক্ষে 256GB SSD নাওয়া প্রয়োজন। SSD তে উইন্ডোজ ইন্সটল থাকার সুবিধা হচ্ছে আপনার ল্যাপটপ অনেক দ্রুত ওপেন হবে, অ্যাপ্লিকেশনগুলো SSD তে ইন্সটল করলে সেগুলো দ্রুত কাজ করবে। আর photos, videos, pdf ইত্যাদি ডকুমেন্ট HDD তে রাখলেই হবে কারন এগুলো খুব দ্রুত রান করার প্রয়োজন হয় না। ল্যাপটপে সাধারনত 1TB(1 Terabyte -> 1000 Gigabytes) HDD থাকে। অনেক ল্যাপটপে শুধু HDD দাওয়া থাকে এবং একটি এক্সট্রা SSD slot দাওয়া থাকে যেন আপনি পরবর্তীতে SSD লাগিয়ে নিতে পারেন। এই এক্সট্রা স্লট M.2 NVMe কিনা সেটা চেক করে কিনবেন। ল্যাপটপে SSD না থাকলে কিনার সময় এক্সট্রা SSD কিনে লাগিয়ে SSD তে উইন্ডোজ ইন্সটল করে নাওয়া ভাল হবে। আপনার বাজেট বেশি থাকলে আপনি বেশি স্টোরেজের SSD নিতে পারেন। ল্যাপটপের জন্য সাধারনত SATA এবং NVMe এই দুই ধরনের SSD বেশি ব্যবহৃত হয়। SATA থেকে NVMe SSD অনেক বেশি ফাস্ট হয় কিন্তু NVMe এর দাম অনেক বেশি হয়। NVMe বেশি স্টোরেজের SSD নিতে পারলে সবচেয়ে ভাল হবে। এছাড়া স্টোরেজের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে read and write speed। এটা যত বেশি হবে সেই স্টোরেজ ডিভাইস তত ফাস্ট কাজ করবে। তাই বেশি read and write speed সম্পন্ন স্টোরেজ বাছাই করা জরুরী।
গ্রাফিক্স (Graphics): ডিসপ্লেতে ইমেজ শো করা, ইমেজ রেন্ডারিং, ইমেজ ম্যানিপুলেশন ইত্যাদি কাজ গ্রাফিক্সের মাধ্যমে হয়ে থাকে। গ্রাফিক্স না থাকলে আমরা ল্যাপটপ ডিসপ্লেতে কিছু দেখতে পেতাম না। প্রসেসরের সাথে বিল্ট ইন গ্রাফিক্স থাকে। লো বাজেটের ল্যাপটপ গুলোতে আলাদা কোনো গ্রাফিক্স কার্ড দাওয়া থাকে না। এগুলো প্রসেসরের Integrated graphics ব্যবহার করে। নর্মাল ইউসেজের জন্য প্রসেসরের Integrated graphics দিয়েই কাজ চলে যায়। কিন্তু আপনি ল্যাপটপে গেমিং, high resoulation video rendering করতে চাইলে পাওয়ার্ফুল গ্রাফিক্স কার্ড সহ গেমিং ল্যাপটপ কিনতে হবে। পাওয়ার্ফুল গ্রাফিক্স কার্ড থাকলে ল্যাপটপের চার্জ দ্রুত শেষ হয় কারণ গ্রাফিক্স কার্ড অনেক পাওয়ার কন্সিউম করে। তাই গেমিং ল্যাপটপ নাওয়ার সময় ল্যাপটপের ব্যাটারি ব্যাকআপ কেমন সেটা ভাল মত দেখে নিবেন।
ব্যাটারি (Battery): চার্জ না দাওয়া অবস্থায় ল্যাপটপ কতক্ষণ ব্যাকআপ দিতে পারবে সেটা ল্যাপটপের ব্যাটারি এর উপর নির্ভর করে। যেই ল্যাপটপের ব্যাটারি বেশি ভাল সেটি চার্জ না দিয়ে বেশি সময় ধরে চালানো যাবে। ল্যাপটপের ব্যাটারি সাধারণত Wh(Watt hour) দিয়ে হিসাব করা হয়। যে ল্যাপটপের Wh যত বেশি সেই ল্যাপটপ সাধারণত তত বেশি ব্যাকআপ দিবে। তবে এটি ল্যাপটপের power consumption অথবা ল্যাপটপ কত বেশি পাওয়ার খরচ করছে সেটার উপর ডিপেন্ড করে। যদি একটি ল্যাপটপ 100Wh এর হয় এবং সেটি নর্মাল ইউসেজে 10watt পাওয়ার ব্যবহার করে তবে সেই ল্যাপটটি ১০ঘন্টা ব্যাকআপ দিবে। ল্যাপটপে ভারি কোনো কাজ যেমন ভিডিও রেন্ডারিং অথবা ইমুলেটর চালানো ইত্যাদি করার সময় power consumption বেড়ে যায়। তখন ব্যাটারি তাড়াতাড়ি খরচ হয়। গেমিং ল্যাপটপগুলোতে powerful graphics card থাকার কারণে বেশি power consumption হয় এবং ব্যাটারি ব্যাকআপ কম পাওয়া যায়। তবে বর্তমান গেমিং ল্যাপটপগুলো ভালোই ব্যাটারি ব্যাকআপ দেয়। ল্যাপটপ সিলেক্ট করার সময় সেটির ব্যাটারি watt hour বেশি কিনা এবং চার্জারের watt বেশি কিনা সেটি দেখে কিনবেন।
কীবোর্ড (Keyboard): ল্যাপটপের কীবোর্ডের ক্ষেত্রে দেখার বিষয় হচ্ছে কীবোর্ড স্টাইল, Backlit কিনা এবং নামপ্যাড আছে কিনা। ল্যাপটপের কীবোর্ড সাধারণত Traditional, Chiclet and Mechanical এই ৩ ধরনের হয়ে থাকে। তবে Chiclet (or island) স্টাইলের কীবোর্ড বেশিরভাগ ল্যাপটপে ব্যবহৃত হয় এবং এটাই আমার কাছে বেশি কম্ফোর্টেবল মনে হয়। Backlit মানে হচ্ছে কীবোর্ডে লাইট জ্বলে কিনা। কম আলোতে কাজ করতে backlit keyboard সাহায্য করে। কিছু ল্যাপটপে numpad থাকে আবার কোনোটায় থাকে না। সাধারণত ডিসপ্লে ১৫ ইঞ্চির ছোট হলে কীবোর্ডে নামপ্যাড থাকে না। আপনার নামপ্যাড দরকার হলে নামপ্যাড সহ ল্যাপটপ সিলেক্ট করবেন।
I/O Ports: ল্যাপটপে কি কি Input Output ports আছে সেটা দেখে কিনতে হবে। সাধারণত USB Type-C, USB 3.0, USB 2.0, HDMI / Displayport, Headphone jack port এগুলো সবচেয়ে দরকারি পোর্ট। USB Type-C পোর্ট দিয়ে আপনি Type-C Hub ব্যবহার করে আরো অনেক পোর্ট যুক্ত করতে পারেন। তাই ল্যাপটপে USB Type-C পোর্ট থাকা প্রয়োজনীয় বলে আমি মনে করি। USB 3.0, USB 2.0 দিয়ে আপনি পেন্ড্রাইভ অথবা যে কোনো USB ডিভাইস ল্যাপটপের সাথে কানেক্ট করতে পারবেন। USB 3.0 দিয়ে USB 2.0 থেকে বেশি ফাস্ট ডাটা ট্রান্সফার হবে। HDMI, Displayport, VGA port দিয়ে আপনি আপনার ল্যাপটপ অন্য একটি মনিটর অথবা টিভি অথবা যে কোনো ডিসপ্লে ডিভাইসের সাথে কানেক্ট করতে পারবেন। এক্ষেত্রে অন্য ডিসপ্লে এক্সটেন্ড করে আপনি ২ স্ক্রিনে ভিন্ন রকম কাজ করতে পারবেন। বর্তমান ল্যাপটপ গুলোতে সাধারণত VGA port থাকে না। তবে আপনার দরকার হলে আপনি HDMI to VGA converter কিনে নিতে পারেন। আপনার যে সব পোর্ট দরকার সেগুলো আপনার সিলেক্ট করা ল্যাপটপে আছে কিনা দেখে কিনবেন।
ওজন (Weight): ল্যাপটপের ওজন সাধারণত ১ থেকে ৩ কেজির মধ্যে হয়ে থাকে। সহজে বহন করার জন্য কম ওজনের ল্যাপটপ কেনা জরুরী। আমি ল্যাপটপ কেনার সময় ল্যাপটপের ওজন কে অনেক গুরুত্ব দেই। কারণ ভারী ল্যাপটপ বহন করা কিছুটা কষ্টকর। আমি মনে করি ১ থেকে ২ কেজি ওজনের মধ্যে ল্যাপটপ কেনা ভাল। ২ কেজির বেশি ওজন হলে ল্যাপটপ বহন করতে কষ্ট হতে পারে।
এখানে আমি ল্যাপটপের মূল কম্পোনেন্টগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করেছি। এবার ম্যাকবুক নিয়ে আলোচনা করি। ম্যাকবুকের দাম অন্যান্য ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের চেয়ে তুলনামূলক বেশি হয়। ম্যাকবুক নির্মাতা অ্যাপলের লেটেস্ট M1, M2 চিপ (প্রসেসর) গুলো খুব পাওয়ারফুল হওয়ায় অনেকেই ম্যাকবুকের প্রতি ইন্টারেস্টেড হচ্ছেন। আমি ম্যাকবুকের সাথে একটি Ubuntu(Linux Distro) ল্যাপটপ এবং একটি উইন্ডোজ ডেস্কটপ ব্যবহার করি। আমার একসাথে অনেক কাজ করতে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি শুধু ম্যাকবুক দিয়ে আমি আমার সব কাজ করতে পারতাম না, সাথে একটি উইন্ডোজ ডিভাইস দরকার হত। আপনি যদি নর্মাল ইউসেজের জন্য যেমন অফিস ওয়ার্ক, ব্রাউজিং, গান শোনা, মুভি দেখা, গ্রাফিক্স ডিজানিং, ভিডিও ইডিটিং এসব কাজের জন্য ল্যাপটপ নিতে চান তাহলে ম্যাকবুক নাওয়া ভাল হবে। আর পাওয়ার্ফুল কাজ করতে চাইলে যেমন অনেক ল্যাঙ্গুয়েজে এক সাথে কোডিং, ভার্চুয়াল অপারেটিং সিস্টেম চালানো, গেমিং, ল্যাপটপ কম্পোনেন্ট কাস্টমাইজেশন এসব করতে চাইলে উইন্ডোজ বেসড ল্যাপটপ নাওয়া ভাল হবে। ম্যাকবুকে কাজ করার সময় আমার মনে হয় যে একটা ক্লোজড সিস্টেমে কাজ করছি, ইচ্ছা মত যে কোনো কিছু চাইলেই করতে পারছি না। ম্যাকবুকের জন্য ফ্রি সফটওয়্যার পাওয়া, এক সাথে একাধিক মনিটর ব্যবহার করা কিছুটা কঠিন। এছাড়া ফাইল পার্মিশনের কারণে কোডিং করার সময় মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়তে হয়। তবে সিকিউরিটি, টাইপিং এক্সপেরিয়েন্স, দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাকআপ, অসাধারণ ডিসপ্লে, অনেক ফাস্ট পার্ফরমেন্স, long term usage, resale value ইত্যাদি দিক থেকে ম্যাকবুক এগিয়ে থাকবে। আমি মনে করি ভাল বাজেট থাকলে একটি ম্যাকবুক আর সাথে একটি কম দামি উইন্ডোজ ল্যাপটপ/ডেস্কটপ নিলে ভাল হবে। আপনি ল্যাপটপে কি কি কাজ করবেন সেটা ঠিক করে ম্যাকবুক কিনবেন কিনা সিদ্ধান্ত নিন।
অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন, 'আমি নতুন CSE (Computer Science & Engineering) এ ভর্তি হয়েছি। কোন ল্যাপটপ কিনলে CSE এর সব কাজ করতে পারব?' CSE তে আমাদেরকে যে প্রোগ্রামিং শেখানো হয় সেটা যে কোনো ল্যাপটপ দিয়েই করা যায়। আপনার ল্যাপটপ যত পাওয়ার্ফুল হবে তত ফাস্ট কাজ করতে পারবেন। তাই আপনার বাজেট অনুযায়ী যে কোনো ল্যাপটপ নিতে পারেন। তবে চেষ্টা করবেন কমপক্ষে intel core i3/ ryzen 3 প্রসেসর, ৮জিবি র্যাম, ২৫৬জিবি SSD সহ ল্যাপটপ নিতে। আর বাজেট বেশি থাকলে ভাল ল্যাপটপ নাওয়ার চেষ্টা করবেন।
আশা করি এই আর্টিকেল পড়ে ল্যাপটপ ব্যাপারে ভাল ধারনা পেয়েছেন এবং এখন থেকে নিজেই পছন্দ করে নিজের জন্য ল্যাপটপ কিনতে পারবেন। আর্টিকেলটি ভাল লাগলে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারেন। শেয়ার করলে কাইন্ডলি ক্রেডিট হিসেবে আমার ওয়েবসাইট মেনশন করে দিবেন। ব্যস্ততার মধ্যে এরকম আর্টিকেল লিখতে অনেক কষ্ট হয়ে যায়। তবু চেষ্টা করি নিজের সীমিত জ্ঞান অন্যদের সাথে শেয়ার করতে। ভবিষ্যতে আরো কিছু আর্টিকেল লিখব ইন শা আল্লাহ। অসংখ্য ধন্যবাদ আর্টিকেলটি কষ্ট করে পরার জন্য।
Written by: Mubeen Ul Alam
Let's build something together! Contact me for any kind of assistance.